প্রবন্ধ
সুভাষচন্দ্র গিরির সারস্বত চেতনায় পরিবেশ ভাবনা : একটি পাখির চোখে অনুধাবন
"In nature there are neither rewards nor punishments; there are consequences"
Robert G. Ingersoll
আলেখ্য : বরুণ কুমার দাস
রবার্ট ইনজেরসোলের উক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যখন তিনি বলেন যে প্রকৃতির কোনো ধরণের শাস্তি বা পুরষ্কার থাকেনা যা থাকে তা শুধুই চরম পরিণতি l
জলবায়ু পরিবর্তন: বিশ্ব উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা যেমন – খরা, বন্যা এবং ঝড় বৃদ্ধি পেয়েছে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি: অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, যা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করছে। বায়ু, জল এবং মাটির দূষণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে, যেমন – শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং অন্যান্য ।
বিভিন্ন দিক দিয়ে পরিবেশ যেভাবে লুন্ঠিত হচ্ছে দূষিত হচ্ছে , আগামী দিনে পরিণতি যে খুব ভয়ানক তার বলার অপেক্ষা রাখে নl l পরিবেশ নিয়ে সচেতনতার সাথেও আন্তরিক প্রয়াস আমাদের সময় অত্যন্ত জরুরী তা না হলে কে বলতে পারে আগামী কয়েক বছরের পরে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্টিফেন হকিংসের ভবিষ্যৎবাণী পুরোপুরি সত্যি হয়ে যাবে এবং বিভিন্ন দূষণের হাত ধরে নেমে আসতে পারে যবনিকা এই নীল গ্রহের জন্য l প্রত্যেকটি সচেতন মানুষ পরিবেশ নিয়ে গভীরভাবে ভাবাটা খুব জরুরী l এটা একটি নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ হওয়া উচিত l বলাবাহুল্য বিভিন্ন সচেতন মানুষ বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন প্রকৃতির এই লুণ্ঠনকে আটকানোর জন্য l দূষণমুক্ত একটি পরিবেশ সুস্থ সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য সবার আন্তরিক প্রয়াস বিভিন্নভাবে রূপায়িত হয়েছে হয়ে থাকে তাই প্রত্যেকটি সমস্যার সমাধানের জন্য কবি এবং লেখকরা নিজের কলম নিয়ে তৈরি থাকেন l বিভিন্ন ধরণের লেখার মাধ্যমে নিয়ে আসতে চান নতুন বিপ্লব ,সচেতনতা , সতর্কীকরণ এবং আমূল পরিবর্তন । ঠিক এইরকম প্রেক্ষাপটে আমার এই প্রতিবেদনে রামনগরের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সুভাষচন্দ্র গিরির সাহিত্য চেতনায় পরিবেশ ভাবনাকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি l
সুভাষচন্দ্র গিরির সবকিচ্ছু লেখার একত্রে প্রকাশিত গ্রন্থ 'খোলা চোখে খোলা মনে' l শিরোনাম মাফিক লেখক খোলা চোখে খোলা মনে সবু কিচ্ছু মূল্যায়ন করতে সক্ষম l সুভাষচন্দ্র গিরির সারা জীবনের সম্বল এই বইতে অনেক কিছুর সম্ভার l এই বইতে কবিতা , প্রবন্ধ , অনুবাদ , গল্পাদি রয়েছে l মুখবন্ধ লিখেছেন খ্যাতিমান কবি ও চিত্রশিল্পী বিষ্ণুসামন্ত l অন্য আঙ্গিকে আলোকপাত না করে সুভাষচন্দ্র গিরির সারস্বত চেতনায় পরিবেশ ভাবনা নিয়েই এগোতে চাইছি l তাই বহু মুখী প্রতিভা সম্পন্ন শিল্পী সত্তার পরিবেশ কেন্দ্রীক ভাবনা সাপেক্ষে আলোচনা l
'খোলা চোখে খোলা মনে' গ্রন্থের’ দাও ফের উৎসব’ কবিতাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ । এই কবিতায় সুভাষচন্দ্র গিরি ভাব ও ছন্দের মেলবন্ধন করে পরিবেশ চেতনার একটা নজির তৈরি করতে সক্ষম । সুধী পাঠকের জন্য এই কবিতার বিশেষ অংশ উপস্থাপনা করছি ।
দাও ফের উৎসব
বিদায় নেবে গো শারদলক্ষ্মী
রূপের পসরা গুটায়ে,
বিষম আকাল ফিরিবে আবার
বিশ্ববেদনা জুটায়ে।
পৃথিবী ব্যাপিয়া অশুভ শক্তি
উগ্রপন্থা দাপিছে,
প্রতিহিংসার হুংকারে শুধু
যে যার স্বার্থ মাপিছে।
প্রকৃতির ক্রোধে মানবের মাঝে
উঠে ‘ত্রাহি ত্রাহি’ রব, ... ( খোলা চোখে খোলা মনে , পৃষ্ঠা ৪০ )
'শীত গ্রীষ্মের কচ কচি' কবিতায় শীত আর গ্রীষ্মের বাদানুবাদ মধ্যে দিয়ে কবি বরফ গলে যাওয়া বিশ্ব উষ্ণায়ন ,ঋতু পরিবর্তন , বাতাসে বিষক্রিয়া কথা বলে সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়ন নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অত্যন্ত সচেতন এবং দায়িত্বশীল কবি ভাবে। । এই কবিতার কিছু নির্বাচিত অংশ উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে –
‘বিষবাষ্পেই মেরুর বরফ গলবে কত আরও ।
সাগর পানি গিলবে দেশ—রক্ষে নেইকো কারও ।
বায়ুমণ্ডল তাতছে যত তুইও তাতিস তত—
সেই তেজেই আমায় হানতে বায়না করিস কত;
ঋতু বংশ ধ্বংস ক'রে তুই পাবি কি পার ?
নিজের তাপে নিজে পুড়বি—পুড়বে এ সংসার
একটা কথা বলি শোন্—মঙ্গল যদি চাস্—
নিজের তাপমাত্রা কমা—নইলে গলায় ফাঁস ।
তোর পিরিতের মারণবাদী বিষাক্ত গ্যাস আজ ।
বাতাসে তার বাড়বাড়ন্ত রণং দেহি সাজ ।
উপায় খুঁজতে ডাকছি তাই সর্বঋতু সভা-
চক্রান্ত আর প্রতিরোধে তোর কত রবরবা ।
অদৃশ্য এই শত্রু রুখতে ডাকবো খোলামনে
পরিবেশের উন্নয়নে আয় না একাসনে । ‘
( প্রাগুক্ত , পৃষ্ঠা ৫০ )
কাক কোকিলের কচাল কবিতায় কবি নিজের কথা বলার মহিমাকে আবার একবার প্রমাণ করেছেন সুন্দর ছন্দ ও শব্দ চয়নে লয়ে রেখে । কাক কোকিলের আড়ালে তিনি আসলে মানুষকেই সচেতন করতে চান নিজেও পরিবর্তনের সামিল হতে চান নোংরা আবর্জনা পরিষ্কার করে সুন্দর একটি পরিবেশ করে তোলার স্বপ্ন দেখেন।
' ডাকটা তোমার মিষ্টি, কিন্তু চিড়ে ভিজে না তাতে ৷
নেমে এসো না নোংরা মাঝে—সাফ করি এক সাথে।’
( খোলা চোখে খোলা মনে , পৃষ্ঠা ৫১)
বিপন্ন শীত কবিতায় আবহার পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট যেখানে কবি বলেছেন শীতের চেহারা দাপট তার পরিচয় ক্রমশ ছোট হতে শুরু করেছে আগের মতন আছে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না তার কারণ হচ্ছে বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং পরিবেশ দূষণ ।
‘এখন গাঁয়ে সাঁঝ-সকালে কেউ জড়ায় না পশমি শাল,
সুতির জামায় শীত যে উধাও এলো একী বিষমকাল ?
চিনা পসারির মাথায় হাত বিকোয় না তার শীত-কাপড়
শীতকালেই বিপন্ন শীত—শীতবুড়ি! একী তোমার চাল ?
বিজ্ঞানীরা বলছে শোন—দোষ তোমার নয় শীতবুড়ি—
গ্লোবাল ওয়ার্মিং আসল কারণ—যা মানুষেরই বাহাদুরি। ‘
(খোলা চোখে খোলা মনে , পৃষ্ঠা ৬০)
মধুঝরা মধুকাল ও কবি মনে আনন্দ নেই, পরিবেশের সংকট কবিকে ঘিরে আছে –
‘ মধুবর্ষী এ লগনে তবু কেন মনমরা কবি ?
উষ্ণায়ন ধ্বংসিবে কি বসন্তের এ মধুর ছবি ?’ ( পৃষ্ঠা ৬৩ )
'সন্ধিকালের বট' কবিতায় বৃক্ষরোপণ নতুন অরণ্য তৈরি করা তার গুরুত্ব এবং সামগ্রিকভাবে সবুজ বাঁচানোর তাগিদ কবিতাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে-
‘এখন আবার গাঁয়ের মানুষ তুলছে সে মহাবট,
বুদ্ধি ক’রেই খুলছে তারা সব সমস্যার জট। ‘ ( ,পৃষ্ঠা ৬৪)
আকাশের দিকে তাকিয়ে কবি নীল খোঁজে পেতে পারেন না ভোরের আকাশে ছড়িয়ে গেছে শুধু বারুদের গন্ধ l দূষণ ,বিশ্ব উষ্ণায়ন ও সবুজ সংহার পরিবেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে করেছে l আসছে আগামী দিনে মহাসংকট তাই কবি সতর্ক হয়ে সাবধান করেছেন এবং সামগ্রিকভাবে পরিবেশের সুস্থতা রক্ষা করার ইঙ্গিত দিয়েছেন কবিতায় বিভিন্ন জায়গায়।
'বিপন্ন পৃথিবীর গান' কবিতাটি কবি সুভাষচন্দ্র গিরির কাব্য প্রতিভার একটি মাইলফলক হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। যে কবিতায় পরিবেশ ভাবনা কবিকে একটা আলাদা মাত্রা দিতে সক্ষম। এই কবিতা থেকে সুস্পষ্ট হয় কবির সামাজিক চেতনা এবং পরিবেশ নিয়ে ভাবনা । গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়ণ পৃথিবীর অস্তিত্বকে বিপন্ন ক'রে তুলেছে। এ বিশ্বের ধ্বংস অনিবার্য—যদি না এ উষ্ণায়ন প্রশমিত হয় কোনোমতে, যে উষ্ণায়ন মানুষেরই অপরিনামদর্শিতার ফল । কবির কলমে..
'শোনো গো মানুষ ভাই—
এই বিশ্বের জল-বায়ু-মাটি
পবিত্র আর নাই।
মানুষেরই লোভে পরিবেশে আজ
দূষণ নিয়েছে ঠাঁই।
মানুষের তাতে নড়ে না টনক লজ্জাও মুখে নাই!
...........................................
দূষণ কারণে রোগ-অঘটন
ঘটে প্রকৃতির বুকে
তা দেখে মানুষ বুঝেও বোঝে না
হঠকারী নীতিভ্রষ্ট—
তাই বলি শোনো ভাই—
দূষণ-দুষ্ট ওই পৃথিবী বাঁচাতে
গণউদ্যোগ চাই,
ধোঁয়া-ধুলো থেকে মুক্ত থাকতে
সবুজ বাঁচানো চাই।
একটি গাছকে কাটার বদলে
দশটি লাগাও ভাই ।
দূষণ-মুক্ত পৃথিবী ছাড়া যে
(জীবের) বাঁচার জায়গা নাই ।'
( বিপন্ন পৃথিবীর গান ,পৃষ্ঠা ১২০)
সুভাষ বাবু নিশ্চিত যে মিষ্টি কথায় আর চিড়ে ভিজবে না তাই কবি কবিতার মাধ্যমে সুন্দরভাবে বলেছেন নামতে হবে মাটিতে 'নেমে আসে না নোংরা মাঝে - সাফ করি একসাথে' l সচেতন স্রষ্টা উৎসবের মুখরিত অবস্থানে ও প্রকৃতির ক্রোধে মানবের মাঝে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে আসার কথা হৃদবোধ করতে পেরেছেন l
অত্যন্ত সচেতন একজন মানুষ এবং একজন সচেতন কবি ভাবে পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলো খুব চমৎকারভাবে ছন্দে রূপায়িত করতে পেরেছেন তার অনেক উদাহরণ এই বইতে বিভিন্ন পৃষ্ঠায় আছে আমি সেগুলো পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। বেশ কিছু কবিতায় কবির পরিবেশ কেন্দ্রিক ভাবনা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুধী পাঠক অবশ্যই যথার্থভাবে মূল্যায়ন করে দেখবে যে সুভাষচন্দ্র
গিরির ভাবনা কতটা সময়োপযোগী এবং সার্থক ছিল l কবি পরিবেশের জন্য খুবই চিন্তিত ও শঙ্কাগ্রস্ত l মানুষযেন নির্বিকার চিত্তে আছে l করোর কোনো ধরণের হেলদোল নেই l চিরকাল কবিদের ভাবতে হয় , সর্তক করেতে, আহ্বান জানাতে হয় l মাঠে নামে কবি, সুপ্ত অবস্থায় থাকা মানুষদের জাগিয়ে তোলে l এই প্রেক্ষাপটে সুভাষচন্দ্র গিরি অত্যন্ত তৎপর , দায়িত্ববান এবং সচেতন নাগরিক l তিনি কলম হাতে পারিবেশ উন্নয়নের অনন্য কান্ডারী হয়ে উঠেছেন l
ঋণ স্বীকার :
সুভাষচন্দ্র গিরি মহাশয়ের সংগে যোগাযোগ ও আলোচনা ২০২২ সের শেষ থেকে কবির প্রয়াণের কয়েক মাস আগে অবধি l
খোলা চোখে খোলা মনে ( রচনা সমগ্র ) প্রকাশিত ২রা অক্টোবর,২০২২
প্রাবন্ধিক ও গল্পকার প্রদীপ কুমার জানা মহাশয়ের সংগে আলোচনা l
রামনগর কলেজের অধ্যাপক ড . অচিন্ত্য কুমার সামন্ত মহাশয়ের প্রবন্ধ, খোলাপাতা
সুভাষচন্দ্র গিরি মহাশয়ের স্মরণে মনন সাহিত্য পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা,
সম্পাদক, কবি ও প্রাবন্ধিক তপন কুমার রণজিৎ এবং গৌতম প্রামানিকের সুপরামর্শ ও সহযোগিতা l
Robert G. Ingersoller র পরিবেশ নিয়ে আলোচনা, গুগল সৌজন্যে l
